Please Select from the List for details

Ayurveda:

Chakrapani Dutta:

Chakrapani Dutta

Chakrapani Dutta (চক্রপাণি দত্ত) বাঙালি আয়ুর্বেদীয় গ্রন্থরচয়িতাদের মধ্যে চক্রপাণি দত্ত শীর্ষস্থানীয়। ‘চক্রদত্ত’ (তথা “চিকিৎসা-সার-সংগ্রহ”) নামে তাঁর বৈদ্যক গ্রন্থটি সমগ্র ভারতের আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসকগণের কাছে অত্যন্ত আদৃত। এছাড়াও চিকিৎসক হিসেবে এবং ন্যায়শাস্ত্র, কাব্যশাস্ত্রের একজন টীকাকার হিসেবে চক্রপাণি প্রখ্যাত ছিলেন।

জন্ম ও বংশপরিচয়ঃ

চক্রপাণি বীরভূম জেলার (মতান্তরে সপ্তগ্রামের) ময়ূরেশ্বর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁদের বংশ লোধ্রবলী দত্ত বংশ (দত্তশর্মা) হিসেবে বৈদ্যগোষ্ঠীতে পরিচিত। চক্রপাণির বংশধর গোপীনাথ দত্ত বিরচিত ‘দত্ত বংশাবলী’ থেকে জানা যায় যে তাঁরা ছিলেন গৌতম গোত্রীয় এবং যজুর্বেদীয় কান্বশাখা অনুসারী। চক্রপাণি গৌড়রাজ নয়পালদেবের/নরপালদেবের সমসাময়িক। নয়পালদেব ১০৩৮ খৃষ্টাব্দে সিংহাসন আরোহণ করেন বলে ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার নির্দেশ করেছেন। অর্থাৎ চক্রপাণি একাদশ শতাব্দীতে বিদ্যমান ছিলেন। তাঁর পিতা নারায়ণ দত্ত ছিলেন নয়পালদেবের অমাত্য এবং রন্ধনশালার উপদেষ্টা। নারায়ণের অপর পুত্র ভানুদত্ত ‘কুমারভার্গবীয়’ নামক গ্রন্থ রচনা করেন। চক্রপাণি নিজের পরিচয় দিয়েছেন এইভাবে - “গৌড়াধিনাথরসবত্যধিকারিপাত্রনারায়ণস্য তনয়ঃ সুনয়োহন্তঙ্গরাৎ ভানুরোনু প্রথিত লোধ্রবলী কুলীনঃ শ্রী চক্রপাণিরিহ কর্তৃপদাধিকারী”।

শিক্ষা ও গ্রন্থরচনাঃ

চক্রপাণি প্রথমে তাঁর পিতার সঙ্গে সহকারী খাদ্য-বিশেষজ্ঞ হিসেবে রাজভবনে নিযুক্ত ছিলেন। এই সময় তিনি আয়ুর্বেদজ্ঞ নরদত্তর কাছে আয়ুর্বেদ অধ্যয়ন করেন। এছাড়া ন্যায়শাস্ত্রেও তিনি ব্যুৎপত্তি লাভ করেছিলেন। আয়ুর্বেদ অধ্যয়ন সমাপনান্তে ইনি নয়পালদেবের রাজবৈদ্য পদে নিযুক্ত হন।

চিকিৎসাবিষয়ক নানা গ্রন্থ তিনি রচনা করেন। তার মধ্যে বিশেষরূপে উল্লেখযোগ্য হল ‘চিকিৎসা-সার-সংগ্রহ’, যা চরকের সর্বশ্রেষ্ঠ টীকা হিসেবে গণ্য হয়। তাঁর নামানুসারে গ্রন্থটি 'চক্রদত্ত' হিসেবেই অধিক পরিচিত। এছাড়া তিনি ‘ভানুমতী’ নামক সুশ্রুতের টীকা, 'চিকিৎসাস্থানটিপ্পন', 'আয়ুর্বেদদীপিকা', 'বৈদ্যকোষ' ইত্যাদি বৈদ্যক গ্রন্থ রচনা করেন। 'চক্রদত্ত' গ্রন্থে চরক-সুশ্রুত-বাগভট-হারীত-শালিহোত্র-কৃষ্ণাত্রেয় প্রমুখ ধ্রুপদী আয়ুর্বেদীয় পণ্ডিতদের তত্ত্বের সঙ্গে বৌদ্ধ রসশাস্ত্রীদের (যেমন সিদ্ধসার, দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান প্রমুখ) তত্ত্বও উল্লেখিত হয়েছে। লক্ষণীয় ধ্রুপদী বৃহৎত্রয়ী (চরক-সুশ্রুত-বাগভট) বা অন্যান্য পূর্বকালীন আয়ুর্বেদীয় লেখকরা ক্ষারসূত্রের উল্লেখ করলেও ক্ষারনির্মাণ বিধির বিষয়ে তারা কিছু লিখে যাননি। এযাবৎ প্রাপ্ত গ্রন্থাদির মধ্যে ‘চক্রদত্ত’তেই প্রথম হরিদ্রামিশ্র চূর্ণের মধ্যে সূত্রগুচ্ছ ক্রমান্বয়ে আবর্তনের মাধ্যমে ক্ষার নির্মাণ এবং নানারোগে তা ব্যবহারের নির্দেশিকা দৃষ্ট হয়। পরবর্তীকালে ভাবমিশ্র বা অন্যান্য বৈদ্যকগ্রন্থকাররা এই পদ্ধতিই অনুসরণ করেছেন। চক্রপাণি চরক-সুশ্রুতের তত্ত্বে পাণ্ডিত্যের জন্য ‘চরক-চতুরানন’ এবং ‘সুশ্রুত-সহস্রনয়ন’ উপাধি লাভ করেন। শিবদাস সেন পরবর্তীকালে চক্রদত্তর টীকা রচনা করেন।

চিকিৎসাপ্রসিদ্ধি ও মন্ত্রিত্বঃ

আয়ুর্বেদাচার্য চক্রপাণি একজন দক্ষ চিকিৎসকও ছিলেন। সমসাময়িক আরেকজন চিকিৎসক গোবর্ধন দত্ত চক্রপাণির বিশেষ সুহৃৎ ছিলেন। চক্রপাণির চিকিৎসাখ্যাতি বহুদূরব্যাপী ছিল। শ্রীহট্টের রাজা গৌরগোবিন্দ তাঁর উদরাময় রোগের চিকিৎসার জন্য চক্রপাণিকে শ্রীহট্টে আমন্ত্রণ জানান। চক্রপাণির চিকিৎসাগুণে রাজা আরোগ্যলাভ করলে কৃতজ্ঞতাবশতঃ তিনি চক্রপাণিকে শ্রীহট্টে বসবাস করতে অনুরোধ করেন। কিন্তু চক্রপাণি গঙ্গাহীন অঞ্চলে বাস করতে অনিচ্ছুক ছিলেন (এইসময় সম্ভবতঃ তিনি সপ্তগ্রামে বসবাস করতেন)। অবশেষে তিনি নিজ মধ্যম পুত্র মহীপতিকে শ্রীহট্টের দক্ষিণসুর এবং কনিষ্ঠ পুত্র মুকুন্দকে গয়ার নামক স্থানে বাস করবার অনুমতি দেন। রাজা সানন্দে ঐ অঞ্চলে বিপুলপরিমাণ জমি অন্যান্য সম্পত্তিসহ চক্রপাণির দুই পুত্রকে বসবাসের জন্য দান করেন (এই দানবিষয়ক তাম্রলিপিও পরে আবিষ্কৃত হয়েছে)। চক্রপাণি নিজ জ্যৈষ্ঠপুত্র সহ রাঢ়ে প্রত্যাগমন করেন।

গুরুপদ হালদারের মতে চক্রপাণি পরবর্তীকালে নয়পালদেবের রাজমন্ত্রীর ভূমিকা পালন করেছিলেন।

জ্ঞাত গ্রন্থতালিকাঃ

১) চক্রদত্ত (তথা ‘চিকিৎসা-সার-সংগ্রহ’ তথা ‘চক্রদত্তসংগ্রহ’)

২) ভানুমতী (সুশ্রুতের টীকা)

৩) চিকিৎসাস্থানটিপ্পন

৪) আয়ুর্বেদদীপিকা (তথা ‘চরকতাৎপর্যটীকা’)

৫) সর্বসারসংগ্রহ

৬) দ্রব্যগুণ-সংগ্রহ

৭) বৈদ্যকোষ

৮) ব্যগ্রদরিদ্র শুভঙ্কর (তথা ‘শুভঙ্কর’)

৯) চরকটীকা

১০) মাঘটীকা

১১) দশকুমারচরিত উত্তরপীঠিকা

১২) কাদম্বরী টীকা

১৩) গৌতমের ন্যায়সূত্রের টীকা

১৪) ব্যাকরণতত্ত্বচন্দ্রিকা

১৫) শব্দচন্দ্রিকা

তথ্যসূত্রঃ

১) গুরুপদ হালদার, “বৈদ্যক বৃত্তান্ত”, ১৯৫৪

২) ডঃ ত্রিভঙ্গমোহন সেনশর্মা, “কুলদর্পণম”, প্রথম সংস্করণ, বহরমপুর নিউ আর্ট প্রেস, ১৩৪৯ বঙ্গাব্দ

৩) রমেশচন্দ্র মজুমদার, “History of Ancient Bengal”, ১৯৭১